ক্রিকেটে অলরাউন্ডার বলে একটি কথা আছে। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এই অলরাউন্ডারের সবচেয়ে যুতসই অ্যাম্বাসেডর একজনই, তিনি কিশোর কুমার। ব্যক্তিজীবনে দুর্ভাগ্য যেমন পিছ ছাড়েনি, রূপালি জগতে তাঁর সৌভাগ্য ছিল এর চেয়ে ঢের বেশি। অবশ্য হওয়ারই কথা, কিশোর তো কোনো তালিম নেওয়া স্টার নন, তিনি ‘ঈশ্বর প্রদত্ত’ মহাতারকা। ১৯২৯ সালের আজকের দিনটিতেই জন্ম হয়েছিল আভাষ কুমার গাঙ্গুলীর, যাঁকে আমরা কিশোর কুমার নামে চিনি।

কিশোর কুমারের নামের আগে অনেক পেশাদারি বিশেষণ জুড়ে দেওয়া যায়। গায়ক, প্লেব্যাক গায়ক, নেপথ্য গায়ক, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, রেকর্ড প্রযোজক- আরো কিছু কী ছিল, কে জানে! আরো কোনো পেশাদারি পরিচয় বা গুণ থাকলে, নিঃসন্দেহে, তাতেও নিশ্চয়ই এগুলোর থেকে কম যেতেন না কিশোর! উল্লিখিত সব কটি পরিচয়েই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী যে কেবল তিনিই ছিলেন।

পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশক। পেশাদারির চুলচেরা মাপকাঠিতে বছর পঁচিশেকের মতো সময় হবে হয় তো। এই টাইমলাইনে ভারতীয় ছবিতে অনেক বড় তারকার উত্থান-পতন ঘটেছে, এসেছেন রাজেশ খান্নার মতো ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ সুপারস্টার, ‘অ্যাংরি ইয়ংম্যান’ তত্ত্বের প্রবর্তক অমিতাভ বচ্চন, খলচরিত্রের প্রবাদপুরুষ আমজাদ এসেছেন ও বিদায় নিয়েছেন ধরাধাম থেকে। কাপুর পরিবারের ক্রমিক ডমিনেশন, গ্ল্যামারের ঝলকানি, অল্টারনেটিভ ছবির আবির্ভাব-আরো কত কিছু ঘটেছে এ সময়ে! এরই মধ্যে কিশোর কুমার একাই ছিলেন একটি ইন্ডাস্ট্রি। কী গানে, কী অভিনয়ে! কেবল তাই নয়, কিশোরের পরবর্তীকালে কুমার শানু, অভিজিৎ, বাবুল সুপ্রিয়-এঁরাও তো ‘কিশোর-কণ্ঠ’ করেই ক্যারিয়ার গড়লেন। ছেলে অমিত কুমার বংশগতির প্রভাব, না কি সেই ‘কপি’ থিওরি অবলম্বন করেছিলেন- সে বিতর্ক অন্য সময়ের জন্য তোলা থাকুক। বাস্তব এটাই, কিশোরের গান নিয়ে এখনো নতুন নতুন পরিবেশনা হয়, রিমিক্সও নেহাত কম হয় না।

রুমা গুহঠাকুরতা, মধুবালা, যোগিতা বালি, লিনা চন্দভারকর- কিশোরের জীবনে চার নারী। এই চারটি বিয়ে একের পর এক এসেছে তাঁর জীবনে। ফিল্মি বোদ্ধারা বলতেন, ‘চেইনিং অব ফলস ডিসিশনস’! কিশোরের কণ্ঠ এভারগ্রিন ছিল, তবে তাঁর জীবনটা সবসময়ই উত্থান-পতনে ভরপুর। জাগতিক সুখের ছোঁয়া সেখানে সামান্যই ছিল। এরই ফাঁকে একদিন নিজের গানের মতোই, বলা চলে অকালেই বিদায় নেন কিশোর কুমার। তবে সময়ের চক্রে হারিয়ে যাননি তিনি। একেই বলে টাইমলেস ক্লাসিক। একক এবং অদ্বিতীয় কিশোর কুমার।