মাত্র ছয় বছর বয়সে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কণ্ঠস্বর হয়ে যায় খড়খড়ে। ওই শিশুর গলার আওয়াজ শুনলে মানুষ বিরক্ত হতো। আর ওই শিশুই যদি গলা ছেড়ে গান ধরত? অসহ্য ঠেকত অন্যদের কাছে। সবাই যেন বলতে চায়- থাক বাবা গান না অন্য কিছু করো। একদিন বাড়িতে রাখা বটিতে পা কেটে যায় ওই শিশুর। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। বন্ধ হচ্ছে না শিশুর কান্না। পায়ে লাগল সেলাই। তাতে বাড়ল যন্ত্রণা আর কান্না দুটোই। কাঁদতে কাঁদতে ওই শিশু একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙার পর শিশুটি ডাকছে সবাইকে। একি? ওর গলার স্বরই গেছে বদলে। এও কি সম্ভব?

শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল আভাস কুমার। যাকে সারা বিশ্ব চেনে কিশোর কুমার নামে। বাংলা ও হিন্দিগানে যুগের পর যুগ সব ধরনের শ্রোতাদের মন এখনো জয় করছেন তিনি। শুধু গান নয়, অভিনয়েও মাতিয়েছেন রুপালি পর্দা। কিন্তু গলার আওয়াজ টানা কান্না আর এক ঘুমে বদলে যাওয়ার মতোই বিচিত্র কিশোরের জীবন।

গতকাল ৪ আগস্ট ছিল কিশোর কুমারের জন্মদিন। ১৯২৯ সালের ওই দিনে ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ছোট্ট শহর খান্ডোয়াতে বম্বে বাজার মোড়ের গাঙ্গুলি পরিবারে জন্ম কিশোর কুমারের। বাবা খ্যাতনামা আইনজীবী কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি। মা গৌরি গাঙ্গুলি। গাঙ্গুলি পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে কিশোর ছিলেন ছোট। বড় ছেলে অশোক কুমার। তারপর মেয়ে সীতা, তারপর অনুপ কুমার, সর্বশেষে জন্ম হয় কিশোর কুমারের। ভাইদের সঙ্গে নামের মিল রেখে কিশোরের নাম রাখা হয় আভাস কুমার। জন্মের পর থেকে ভাই-বোনদের মধ্যে দুরন্ত ছিলেন সবচেয়ে বেশি কিশোর। অনেকে বলেন, জন্মগত প্রতিভা নিয়েই নাকি জন্মেছিলেন গাঙ্গুলি বাড়ির এই ছোট ছেলে।

শৈশবেই দুরন্ত ছিলেন কিশোর। বছর পাঁচেক বয়েস থেকেই দুষ্ট বুদ্ধিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। দিদি সীতা এবং দাদা অনুপকুমার ছিলেন তাঁর ‘সফট টার্গেট’। কিশোর কুমারের বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি নিজেও ছিলেন খুব মজার মানুষ। শোনা যায়, বাবার থেকেই হাসিখুশি আর মজা করতে শেখার হাতেখড়ি কিশোরের। একদিনের ঘটনা, বছর তিনেকের শিশু কিশোরকে কাঁধে চাপিয়ে বাবা কুঞ্জলাল বের হতেন হাটে-বাজারে। রাস্তায় অসংখ্যবার থামতে হতো তাঁকে। সমাজের উঁচুতলার মানুষ বলে সবাই তাঁকে যথেষ্ট সমাদার করতেন। কিন্তু পথে বেরিয়ে বাবার কাঁধে চেপে যেতে যেতে শিশু কিশোর বাবার টাকে চাপড় মেরে তবলা বাজানোর স্বাদ পেতেন।

কিশোর কুমার ছিলেন এক রহস্যময় প্রতিভা। যে প্রতিভার সঙ্গে মিশে ছিল দুরন্তপনা আর পাগলামি। সেই অর্থে কোনো প্রথাগত শিক্ষার ধার দিয়েও যাননি তিনি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক তাঁর বড় ভাই অশোক কুমারের কাছ থেকেও নেননি কোনো প্রথাগত তালিম। কিশোর কুমার কোনোদিন তারকা হতে চাননি। জীবনের মধ্যগগনে তারকা হয়েও তারকা সাম্রাজ্যকে তিনি বিদ্রূপের চোখেই দেখতেন। শোনা যায়, কিশোর তাঁর জীবদ্দশায় বলতেন, এই শহরে কেউ কারো বন্ধু নয়। সবাই সবাইয়ের শত্রু। বরং তিনি মনে করতেন, তাঁর জন্মশহর খান্ডোলা অনেক ভালো। তাই তো তিনি যখন খ্যাতির শিখরে, সেই সময় একদিন ঠিক করে ফেলেছিলেন, মুম্বাই শহর ছেড়ে তিনি চিরকালের মতো চলে যাবেন খান্ডোলা শহরে। কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। হৃদয়ের ছন্দপতনে অকালেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো তাঁকে। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে সবাইকে ছেড়ে চিরতরে চলে যান তিনি। কিন্তু যাওয়ার আগে তাঁর অসংখ্য অনুরাগীর জন্য রেখে গেলেন সংগীত আর অভিনয়ের বিশাল এক সাম্রাজ্য।

কিশোরের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ধরনের বিচিত্র কাহিনী রয়েছে। যার তালিকাটা অনেক লম্বা। সেই লম্বা তালিকা থেকে বেছে বেছে ১০টি ঘটনা পাঠকদের জন্য।

১) কিশোর কেন মুম্বাইতে এলেন সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বরাবরই কিশোরীয় স্টাইলে বলতেন, “আরে, আমার দাদা অশোক কুমার তো এখানকার হিরো ছিল। আমি তো দাদার কাছেই এসেছিলাম। এরা তো সবাই আমাকে ধরেবেঁধে নায়ক করে দিল। দাদার সঙ্গে বোধহয় কী একটা ছবি… ‘শিকারি’ হবে বোধহয়। সেইটাতে অভিনয় করার পর থেকেই অনেকে আমাকে অভিনয় করতে বলে। আর আমিও পালিয়ে বেড়াই। শেষমেশ দাদা জোর করে ‘আন্দোলন’ নামে একটা ছবিতে নায়ক করে দিল আমায়।” চলচ্চিত্রে কোনোদিনই সিরিয়াস হননি কিশোর। ইচ্ছে করেই গোলমাল বাধিয়েছেন মাঝে মাঝেই। কখনো ক্যামেরার সামনে ভুল সংলাপ বলেছেন, কখনো অকারণে হেসেছেন, আবার কখনো ডিগবাজি পর্যন্ত খেয়েছেন।

২) গৃহস্থ লোকের বাড়ির ফটকের সামনে লেখা থাকে ‘কুকুর হইতে সাবধান। কিন্তু কিশোর কুমার তাঁর ওয়ার্ডেন রোড অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে একটি ফলক টানিয়ে লিখে রেখেছিলেন, ‘বিঅ্যাওয়ার অব কিশোর’। একদিন পরিচালক এইচ এস রাওয়াল সেই ফলক না দেখেই সোজা তাঁর বাড়িতে ঢুকে যান। আসলে কিশোরের থেকে ধার নেওয়া কিছু টাকা শোধ করতেই তিনি তাঁর বাড়িতে আসেন। টাকা ফেরত দেওয়ার পর পরিচালক যখন করমর্দনের জন্য তাঁর দিকে হাত বাড়ান, তখন কিশোর কুমার তাঁর হাতে কামড়ে দেন। পরে বলেন, আপনি কি ফলকটি দেখে বাড়িতে ঢোকেননি?

৩) কিশোর কুমারের এই ধরনের ক্ষ্যাপা স্বভাবের দরুন ব্যতিব্যস্ত হয়ে একবার এক পরিচালক প্রযোজকের কাছে অনুরোধ করেন, কিশোর যেন শুটিংয়ের সময় পরিচালকের নির্দেশ অমান্য করে কিছু না করেন। তারপর ওই পরিচালকের একটি শুটিংয়ের গাড়ি চালানোর দৃশ্যে পরিচালক কাট বলতে ভুলে যাওয়ায় কিশোর সোজা গাড়ি চালিয়ে খান্ডোলা চলে যান।

৪) ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতে জরুরি অবস্থা চলাকালীন কিশোর কুমারকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ’২০ পয়েন্ট প্রোগ্রাম’-এর প্রচার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু তাতে কিশোর রাজি হননি। ফলে তাঁকে অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং বিবিধ ভারতী থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

৫) নকল করতে ওস্তাদ ছিলেন কিশোর। ‘পড়োসান’ ছবিতে নিজের মাকে নকল করেন তিনি। চোখে কাজল পরে, লম্বা চুল পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে, পান মুখে দিয়ে একটি দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তাঁর অভিনয় দেখার পর ছবিটির আরো দুই অভিনেতা মেহমুদ এবং সুনীল দত্ত নিজেদের অভিনয় কৌশলকে আরো সড়গড় করতে দুদিনের বিরতি নিয়েছিলেন। তা না হলে কিশোরের অভিনয়ের কাছে তাঁদের অভিনয় কোনো স্থানই পেত না।

৬) একবার এক প্রযোজক কিশোর কুমারকে তাঁর প্রাপ্য অর্থের অর্ধেক দিয়ে বলেছিলেন, বাকি পাওনা ছবির কাজ শেষ হলে মিটিয়ে দেবেন। পরের দিন কিশোর কুমার অর্ধেক চুল কেটে এবং অর্ধক গোঁফ কামিয়ে শুটিংয়ে এসে বললেন, পুরো টাকা না পাওয়া অবধি তিনি এভাবেই শুটিং করবেন।

৭) কলেজে পড়ার সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইতে রীতিমতো ভয় পেতেন কিশোর কুমার। তাই রিনি কলেজের অনুষ্ঠানে পর্দার পেছনে দাঁড়িয়ে গান গাইতেন। শোনা যায়, তিনি কলেজ ছেড়ে আসার সময় কলেজ ক্যান্টিনে পাঁচ টাকা ধার করে রেখেছিলেন। সেখান থেকেই নাকি পরবর্তীতে তিনি লিখেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান, পাঁচ রুপাইয়া বারো আনা’।

৮) কিশোরের দাদা অশোক কুমার নিজেই বলতেন, ছোটবেলায় ওর গানের গলা খুবই খারাপ ছিল। কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ করে একদিন ওর গলা ঠিক হয়ে যায়। কারো কাছে গান শেখেননি কিশোর। অথচ ভারতীয় গানের জগতে তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান। লতা মঙ্গেশকর বলেছেন, ‘গানের জগতে আমি একমাত্র ভয় পেতাম কিশোরকেই। গাইতে গাইতে সরগমে কোথায় কী করে দেবে, আমি মুখ থুবড়ে পড়ব।’

৯) চারবার বিয়ে করেছেন কিশোর কুমার। প্রথম বিয়ে এক বাঙালি মেয়েকে। নাম রুমা। কিশোর কুমার গাঙ্গুলির মধ্যে বাঙালিয়ানা ছিল ভরপুর। রুমার সঙ্গে আট বছরের বিবাহিত জীবন ছিল তাঁর। সেই সময়েই ছেলে অমিতের জন্ম হয়। এর পরেই কিশোর প্রেমে পড়েন মধুবালার। ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ বা ‘ঝুমরু’ সিনেমায় অভিনয় করতে করতেই এই প্রেম। এই প্রেম জানতে পেরেই কিশোরের কাছ থেকে নীরবে সরে এসেছিলেন রুমা। আশ্চর্য বিষয় ছিল, মধুবালার মৃত্যু আসন্ন জেনেও (মধুবালার হার্টে যে রোগ ছিল তাকে বলে ভেন্টিকুলার সেপটাল, যে রোগে সেই সময় একলাখে একজন বাঁচত অপারেশনে) তাঁকে বিয়ে করেছিলেন কিশোর। মধুবালার মৃত্যুর পর কিশোরের তৃতীয় স্ত্রী যোগিতা বালি। এই বিয়েও বেশিদিন টেকেনি। সবশেষে বয়সের অনেক তফাত সত্ত্বেও কিশোর বিয়ে করেন তরুণী লীনা চন্দ্রভারকে। আশ্চর্য হলেও সত্যি, সারা জীবন কিশোর তাঁর জীবনসঙ্গিণী বেছেছেন সংগীতজগৎ থেকে নয়, অভিনয়জগৎ থেকেই। অথচ সেই অভিনয় জগৎটাই কিশোরের অসহ্য মনে হতো। অভিনেতা কিশোরকে কিশোর কোনো সময়ই সহ্য করতে পারতেন না। কোনো নকল জগৎ ছি তাঁর কাছে অসহ্য।

১০) কিশোর ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। একবার সত্যি সত্যি কিশোর মুম্বাইয়ে তাঁর বাড়ি গৌরীকুঞ্জের চারধারে খাল কাটতে শুরু করেছিলেন। বলেছিলেন, আমার বাড়ির চারধারে থাকবে জল, যেখানে নৌকা ভাসবে, খান্ডোলার প্রকৃতিকে আমি নিয়ে আসব মুম্বইয়ে গৌরীকুঞ্জের চারধারে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত মুম্বাই মিউনিসিপ্যালিটির সক্রিয় হস্তক্ষেপে কিশোর ওই কাজ করে উঠতে পারেননি।

১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর কিশোর কুমার মারা যান। এরপর কিশোরকে নিয়ে যাওয়া হয় খান্ডোলায় তাঁর জন্মভূমিতে, তাঁর প্রিয় শহরে।

কিশোরের ৮৬ তম জন্মদিনে ট্যুইট-

অমিতাভ বচ্চন : সংগীতসম্রাট কিশোরকুমারের ৮৬তম জন্মদিন। তাঁর মতো বহুমুখী প্রতিভার গায়ক পাওয়া আজ দুষ্কর।

শাবানা আজমি : একসময় আমি রফিভক্ত ছিলাম। জাভেদ আমাকে কিশোর ম্যাজিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল। অসাধারণ প্রতিভা।

লতা মঙ্গেশকর : কিশোর কুমারের মতো শিল্পী না আগে হয়েছে। আর না পরে হবে। এই শিল্পীকে আমার প্রণাম।

আলি ফজল : কিশোর কুমারের স্বর ভারতীয় সিনেমার খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। বিশ্বের মানুষ ভারতীয় ছবির প্রেমে পড়েছিল।

ঋষি কাপুর : আমার সৌভাগ্য যে, বেশ কিছু ছবিতে আমি কিশোর কুমারের গলায় লিপ দিয়েছি। এই কিংবদন্তিকে তাঁর জন্মদিনের প্রণাম।