১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ছিলেন না। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রামে ছিলেন। ফাতেমা জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন। ক্ষমতাসীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে জয়ের আশা নিয়েই বিরোধীরা ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করে ভোটযুদ্ধে নেমেছিল। ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণায় শেখ মুজিব যখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, তখনই তার ঘর আলো করে এক নতুন শিশুর আগমন ঘটে। চট্টগ্রামে বসেই তিনি জানতে পারেন সন্তান জন্মের খবর। এই শিশুরই নাম রাখা হয় রাসেল। কেন এই নাম তা বলার আগে প্রাসঙ্গিক অন্য কিছু কথা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শেখ রাসেল। দুই কন্যা, তিন পুত্র। কন্যা দুজন বেঁচে আছেন। একজন শেখ হাসিনা, অন্যজন শেখ রেহানা। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং কনিষ্ঠতম শেখ রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বাবা-মায়ের সঙ্গেই। একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে, যিনি আবার সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা-স্থপতি, সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার নজির পৃথিবীতে বিরল। সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রনেতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রতিহিংসাবশত বা অন্য কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিবাদে হত্যা কিংবা গুপ্তহত্যার ঘটনা একাধিক ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্র পিতাকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশেই ঘটেছে। পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট এমন অনেককে হত্যা করা হয়েছে, যাদের কোনো রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা ছিল না, যাদের বিরুদ্ধে ছিল না কোনো ধরনের অভিযোগ কিংবা তাদের কারো আবার অপরাধ সংঘটনেরও কোনো ক্ষমতা বা সুযোগ ছিল না। কিন্তু ঘাতক দল বঙ্গবন্ধু পরিবারের কাউকে মার্জনা করেনি, বিবেচনা করেনি কারো বয়স। ভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে থাকায় জীবন রক্ষা পায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা হাসিনা ও রেহানার।

বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল তখন মাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, দশ বছরের শিশু। তার চোখের সামনেই একে একে হত্যা করা হয়েছে বাবা, ভাই, ভাবীদের। মায়ের কাছে গিয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়ে হতবিহ্বল রাসেল ঘাতদের কাছে উপহার পেয়েছিল তপ্ত বুলেট এবং স্নেহময়ী জননীর রক্তাক্ত দেহ। সেদিন অমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও আকাশ ভেঙে পড়েনি কিংবা শিশু হত্যার বিক্ষোভে সেদিন কেঁপে ওঠেনি বসুন্ধরা। সব শিশুর বাসযোগ্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু তার জীবনের উজ্জ্বল সময়গুলো উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু দেশ স্বাধীন করে নিজেকে জীবন দিতে হলো, এমনকি শিশুপুত্রের জীবনও রক্ষা করা গেল না। কিছু বিশ্বাসঘাতক প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকাণ্ডে শরিক হলো, আর পুরো জাতি প্রতিবাদহীন নীরবতায় সব মেনে নিল। যে জাতিকে অমিত সাহসে বলীয়ান করে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার মন্ত্রে করেছিলেন উজ্জীবিত, সেই জাতির এমন অসহায় আত্মসমর্পণ বড় কষ্ট এবং বেদনার।

১৮ অক্টোবর, শেখ রাসেলের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এমন এক হেমন্তের মৃদু শিশিরস্নাত রাতে মুজিব দম্পতির ঘরে জন্ম হয়েছিল এক শিশুর। বঙ্গবন্ধু ছিলেন পৃথিবীবিখ্যাত দার্শনিক-চিন্তাবিদ-শান্তি আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক রার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত। রাসেলের লেখা তিনি পড়তেন। রাসেলকে নিয়ে বেগম মুজিবের সঙ্গে আলোচনাও করতেন। বেগম মুজিব গৃহবধূ হয়েও যে প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়ে উঠেছিলেন, তার পেছনেও ছিল বঙ্গবন্ধুরই অবদান। বঙ্গবন্ধুর কাছে শুনে শুনে বেগম মুজিবও হয়ে উঠেছিলেন রাসেলভক্ত।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমাদের পাঁচ ভাইবোনের সবার ছোট্ট রাসেল। অনেক বছর পর একটা ছোট্ট বাচ্চা আমাদের বাসায় ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বইয়ে যাচ্ছে। আব্বা ব্রার্টান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন। রাসেলের বই পড়ে মাকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের দর্শন শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, নিজের চোট্ট সন্তানের নাম রাখেন রাসেল’। মা-বাবার মনে হয়তো সুপ্ত বাসনা ছিল তাদের ছোট ছেলেটি একদিন বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো যশস্বী-মনস্বী হয়ে উঠবে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাগান শোভিত করে যে পুষ্প কলি মেলেছিল, তা প্রস্ফূটিত হওয়ার আগেই একদল পাষণ্ড সব তছনছ করে দিল। ফুলটি ফুটতে পারল না। সৌরভ ছড়াতে পারল না। শেখ রাসেলের জন্মগ্রহণের সময়টি বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ইতিহাসের জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ কাল। বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন ৪০। তিনি তখন রাজনৈতিক মঞ্চে আরোহনের জন্য একটির পর একটি সিড়ি ভাঙছেন। তার সময়ের অন্য সব বাঙালি নেতার আপসকামিতা-ভীরুতার বিপরীতে তিনি এক আপসহীন সাহসী মানুষ হিসেবে জনগণের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছেন। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু তাকে পরাভূত করতে পারছে না। রাসেলের জন্মের পরের বছরগুলোই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রকৃত উত্থানপর্ব।

১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, পরের বছর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, কারামুক্তি, বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত, ১৯৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক গণরায় লাভ এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। এই তোলপাড় করা সময়েই শিশু রাসেলের হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ে ওঠা। পিতার স্নেহ-সান্নিধ্য তেমন না পেলেও পিতার জনগণমন অধিনায়ক হয়ে ওঠা দেখেছে শিশু রাসেল। তার মানস গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখছিল ওই টালমাটাল সময়কাল।

পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়ায় রাসেল স্বাভাবিকভাবেই সবার চোখের মণি হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু সরকারপ্রধান হওয়ার পরও শিশু রাসেল তার সঙ্গলাভ থেকে বঞ্চিত হয়নি। দেশে কিংবা দেশের বাইরে বঙ্গবন্ধু রাসেলকে সঙ্গী করে আনন্দ পেতেন। এই ছোট ছেলেটিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মনে এবং চোখে ছিল অন্যরকম স্বপ্ন-কল্পনা। রাসেলকে বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তার হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু হায়েনার দল তার স্বপ্নপূরণ করতে দিল না। ঘাতকরা সপরিবারে মুজিব পরিবারকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথও আইন করে বন্ধ করা হয়েছিল। ঘাতকদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। হত্যা, শিশু ও নারী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার পরও যাদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি, তারা একটা সময় পর্যন্ত সদম্ভে আস্ফালন করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। রাসেলের বড় বোন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে পঁচাত্তরের খুনিদের বিচারের আওতায় এনেছেন। শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া যে রাষ্ট্রের কর্তব্য সেটা প্রতিষ্ঠিত করার পথে দেশ অগ্রসর হচ্ছে।

রাসেলের জন্ম হয়েছিল বড় বোন শেখ হাসিনার ঘরেই। রাসেল পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই দেখেছিল ‘হাসু আপা’র মুখ। শেখ হাসিনার আদর-স্নেহেই বড় হয়ে উঠছিল রাসেল। এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, রাসেল হয়ে উঠেছিল শেখ হাসিনার ‘কলিজার টুকরা’। এই ভাইটিকে হারানোর দুঃসহ বেদনা যে তার ভোলার নয়! এই দুঃখভার বুকে নিয়ে, উদ্গত কান্না চেপে দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাকে। আজ যারা বিচারহীনতার কথা বলে, যারা আইনের শাসন নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে তারা কিন্তু রাসেল হত্যার বিচার বন্ধের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করেননি। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারকে হত্যার পর অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি দেশে চালু হয়েছিল তা থেকে বেরিয়ে আসার ধারা শুরু হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।

শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, আর অসহিষ্ণুতা নয়, আর অপরাধীদের প্রশ্রয় বা দায়মুক্তি নয়। বাংলাদেশ হোক সব শিশুর, সব মানুষের নিরাপদ বাসভূমি।